

পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণ-তরুণীদের দক্ষ, আত্মনির্ভরশীল ও কর্মমুখী জনশক্তিতে পরিণত করতে বিভিন্ন কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ও গুইমারা রিজিয়নের আওতাধীন বিভিন্ন সেনা জোনে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাহাড়ের তরুণ-তরুণীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নারী দক্ষতা উন্নয়ন ও পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি জোরদারেও বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আওতায় চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও মেকানিক্যাল খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়েছে। গত ২ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ধাপে ২৩ জনকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন পাহাড়ি ও ৮ জন বাঙালি।
দ্বিতীয় ধাপে ২৩ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও ৩৪ জনকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে ৯ জন পাহাড়ি ও ২৫ জন বাঙালি।
এছাড়া একই সময়ে ১০৮ জনকে মোবাইল ফোন মেরামত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৪ জন পাহাড়ি ও ৬৪ জন বাঙালি। পাশাপাশি কম্পিউটার, যন্ত্রপাতি মেরামত ও ইলেকট্রিশিয়ান প্রশিক্ষণেও পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রাঙামাটি রিজিয়নের আওতায় মোট পাঁচটি বিষয়ে ৯৫ জন তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। গত ২৬ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ১৫ জন পাহাড়ি তরুণীকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া আগামী অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ২০ জনকে টেইলারিং, ২৫ জনকে কম্পিউটার, ১৫ জনকে যানবাহন মেকানিক এবং ২০ জনকে মোবাইল ফোন মেরামত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বান্দরবান রিজিয়নের আওতায় প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে এসি ও ফ্রিজ মেরামত, সেলাই, যানবাহন চালনা ও কৃষি প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া অক্টোবর মাসে ২০ জনকে মোবাইল ফোন মেরামত এবং ডিসেম্বর মাসে ১০ জন তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে গত ২ থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ১৯ জন পাহাড়ি তরুণীকে মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪০ জনকে এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
গুইমারা রিজিয়নের আওতায় স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে। মিডওয়াইফারি ও নার্সিং প্রশিক্ষণ তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২ থেকে ১৫ আগস্ট, ৯ থেকে ২০ আগস্ট এবং ২৯ আগস্ট থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন ধাপে মোট ২৭ জন পাহাড়ি ও ২২ জন বাঙালিকে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ১৮ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ জন পাহাড়ি ও ৫ জন বাঙালিকে মোবাইল ফোন মেরামত এবং ১৭ জন পাহাড়ি ও ৩ জন বাঙালিকে যানবাহন মেকানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি জোরদার করতে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘সম্প্রীতি কাপ’ ফুটবল টুর্নামেন্টে পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তিন পার্বত্য জেলায় এসব প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) প্রতিনিধিরা পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের যাচাই-বাছাই ও নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্দিষ্ট মেয়াদে হাতে-কলমে এসব কারিগরি প্রশিক্ষণ পাহাড়ের তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করছে। কম্পিউটার ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে তরুণরা ঘরে বসে আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে ড্রাইভিং, মোবাইল ফোন, এসি-ফ্রিজ ও যানবাহন মেরামতের মতো প্রশিক্ষণ স্থানীয় বাজারে চাকরি কিংবা নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
নারীদের জন্য মিডওয়াইফারি ও টেইলারিংসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নারী দক্ষতা উন্নয়ন ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনেও ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে পাহাড়ের তরুণ সমাজের আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তরুণদের একসঙ্গে প্রশিক্ষণ ও ক্রীড়া কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি আরও জোরদার হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এসব প্রশিক্ষণ ও সামাজিক কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রামে দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।