

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে শান্তিলাল চাকমাকে হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আলোময় চাকমা (৩২) ও সোহেল চাকমা (২২)। সম্পর্কে আলোময় চাকমা নিহত শান্তিলাল চাকমার ভাতিজা এবং সোহেল চাকমা তার ছেলে। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার প্রধান আসামি আলোময় চাকমা রায় ঘোষণার সময় পলাতক ছিলেন। আদালত সূত্রে আরও জানা গেছে, আলোময় চাকমা পার্বত্য চুক্তিবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফের সক্রিয় সদস্য।
মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুরে রাঙামাটির জেলা ও দায়রা জজ মো. আহসান তারেক নিজ এজলাসে এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতসংশ্লিষ্টরা জানান, রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠার পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দিয়ে এটিই প্রথম রায়।
রায় ঘোষণার সময় আসামি সোহেল চাকমা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে প্রধান আসামি আলোময় চাকমা জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন। আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ও পুনরায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। সোহেল চাকমাকে রায়ের পর জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যেভাবে হত্যা করা হয়
মামলার নথি ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে আলোময় ও সোহেল চাকমা শান্তিলাল চাকমাকে তার ঘর থেকে তুলে নিয়ে যান। পরে প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি সড়কে নিয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে আটকে রাখা হয়। এরপর দা দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করা হয়।
মামলার সাক্ষ্য ও জবানবন্দিতে হত্যার পর ভিকটিমের রক্ত পান করার অভিযোগও উঠে আসে। পরে মরদেহটি কাঠের সঙ্গে বেঁধে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গঙ্গারাম নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার প্রায় নয় দিন পর কাচালং নদীর লাইল্যাগোনা এলাকায় শান্তিলাল চাকমার পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, হত্যাকাণ্ডে দুই আসামিরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আলোময় চাকমা ভিকটিম শান্তিলাল চাকমাকে ঘর থেকে বের করে তার গলায় গামছা পেঁচান এবং ভিকটিমের ছেলে সোহেল চাকমা গামছার অপর প্রান্ত ধরে তাকে সহযোগিতা করেন। ফলে একজনের তুলনায় অন্যজনকে লঘুদণ্ড দেওয়ার সুযোগ নেই।
আদালত আরও বলেন, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আদালত হত্যাকাণ্ডটিকে অত্যন্ত নৃশংস ও নিষ্ঠুর বলে উল্লেখ করেন।
পিপি অ্যাডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু বলেন, “সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামিদের জবানবন্দিসহ সবকিছু রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য আদালত এ রায় দিয়েছেন।” তিনি জানান, মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মামলার বিস্তারিত
স্থানীয় বাসিন্দা বিনয় শঙ্কর চাকমার অভিযোগের ভিত্তিতে সাজেক থানায় ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট মামলাটি করা হয়। মামলার নম্বর ১/২০১৭ এবং জিআর মামলা ২৯৮/২০১৭। দণ্ডবিধির ৩৬৪, ৩০২, ৫০৬, ২০১ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
তদন্ত শেষে সাজেক থানার এসআই সফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার আদালত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আলোময় চাকমা ও সোহেল চাকমাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায়ের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী সাত দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। সোহেল চাকমার আইনজীবী জানিয়েছেন, আসামির পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে তারা উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।